Skip to main content

Communication in Pandemic Times


আমাদের আলাপের বিষয় সংস্কৃতি ও যোগাযোগ। বলা হচ্ছে  যোগাযোগের সার্বজনীন ঘটনার একটা হলো যে, সংস্কৃতি যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে, কিংবা বলা যায় যোগাযোগের উপর সংস্কৃতির প্রভাব আছে। আগের লাইনটা বুঝতে হলে আমাদেরকে সংস্কৃতি ও যোগাযোগকে আলাদাভাবে বুঝতে হবে। একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশে বেশিরভাগ মানুষ যা ভাবে, যা করে, যেভাবে করে, এবং তারা যা সেটাই তাদের সংস্কৃতি। আর মানুষের পরস্পরের কাছে নিজেদেরকে প্রকাশের উপায়কে বলা যায় যোগাযোগ। ভৌগোলিক সীমানার কথা উল্লেখ করেছি, কারণ সীমানা আমাদের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে বা করার চেষ্টা করে এবং বলা যায় সফল। কিছু কিছু আচার সীমানা অতিক্রম করতে পারলেও সংস্কৃতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় না পুরোপুরি। সুতরাং আমরা বলতে পারি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি গড়ে উঠাটা মানুষের এই পৃথিবীর বাস্তবতা, যেটার বিভিন্ন যৌক্তিক কারণ আছে। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বলার, শোনার, গায়বার, শাসনের, শোষণের এবং যোগাযোগের স্বতন্ত্র পদ্ধতি বিরাজ করে। একটা সংস্কৃতি থেকে বা পারিপার্শ্বিকতা থেকে অন্য আরেকটা সংস্কৃতি বা পারিপার্শ্বিকতায় যোগাযোগের পদ্ধতি বদলায়। সংস্কৃতি ভেদে  যোগাযোগের পদ্ধতির উপর শ্রদ্ধা রাখাটাকে বলা যায় সংস্কৃতিকে সম্মান করা। অন্যদিকে বেশীরভাগ মানুষের সংস্কৃতি অনেক সময় অল্প মানুষের সংস্কৃতিকে আঘাতও করতে পারে বা বলা যায় যোগাযোগের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এসবের আলাপের মধ্যে এখন জায়গা করে নিয়েছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তি সীমানাকে অতিক্রম করেছে। সংস্কৃতিকে অতিক্রম করেছে কিনা বা ভিন্ন সংস্কৃতি নির্মান করছে কিনা সেই তর্কটাও অপ্রাসঙ্গিক না।

আমরা উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে পারি কিভাবে যোগাযোগ সংস্কৃতি নির্ভর ব্যাপার। সংস্কৃতি আমাদেরকে শেখায় কিভাবে আমরা এক রকম, কিভাবে আমরা অন্যদের চেয়ে সঠিক, এবং কিভাবে আমরা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো কিভাবে অন্যদের কাছে নিজেদেরকে প্রকাশ করো। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বাঙলা সংস্কৃতি বলে একটা ব্যাপার আছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এটাকে নিজেদের একমাত্র সংস্কৃতি মনে করে, যদিও বাংলাদেশ বহু সংস্কৃতির দেশ। বাঙলা সংস্কৃতি আমাদের যে রকমের ধ্যান ধারণা রীতি তৈরি করেছে, তাতে আধিবাসীদের সংস্কৃতিকে বাংলা সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করি কিংবা যোগাযোগের পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভাষাবাসীর আধিবাসীরা যোগাযোগের ও পড়াশোনার ভাষা হিসাবে বাংলাকে মেনে নিতে হচ্ছে। এখানে যোগাযোগের উপর সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষণীয়। দ্বিতীয় উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি, যেটা আগেরটার থেকে বিপরীতমুখী, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়য় গুলাতে আমাদেরকে পড়তে হয় ইংরেজি ভাষাতে। কারণ কৃষিভিত্তিক সমাজ ভেঙে যান্ত্রিক উৎপাদন ভিত্তিক সমাজ গড়তে গিয়ে ব্যবসা উপযোগী ভাষা হিসাবে ইংরেজির বাজার মূল্য বেশি। এক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে বাজারের সংস্কৃতি বদলে যাওয়াতে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাকে রেখে আমরা ইংরেজিকে গ্রহণ করতেছি বেশি। দুইটা উদাহরণে আমরা দুই রকম ব্যাপার খেয়াল করতে পারি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদেরকে চাপিয়ে দিতে শিখাচ্ছে, আর মুক্তবাজার প্রভাবিত বাজার সংস্কৃতি আমাদের মেনে নিতে বাধ্য করছে।

এই মুহূর্তে, এই পৃথিবীতে মানুষ কোভিড-১৯’র সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে ডিসেম্বর ২০১৯ এ, যখন চীনের উত্তরে হুবাই প্রদেশে কিছু মানুষের মধ্যে একটা অপরিচিত রোগ ধরা পড়ে, যেটা অনেকটা নিউমোনিয়ার মতন।  ২০২০ সাল আসতে আসতে করোনা ভাইরসের প্রাদুর্ভাব বিশ্ব মহামারীতে রূপ নেয়। আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, ও সংস্কৃতির উপরে কোভিড-১৯’র প্রভাব স্পষ্ট। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ব্যক্তি জীবনে আমি খুব আড্ডাবাজ ধরণের, আর টং দোকানে আড্ডা দিতে পারাটা একটা বেহেশতি আরাম দিতো। বলা যেতে পারে আড্ডা দেয়াটা বাংলাদেশের মানুষের একটা সহজাত রীতিতে রূপ নিয়েছে। কোভিড-১৯ একদিন হুট করেই আমার টং দোকেনের এই আড্ডার অভ্যাস বদলে দিলো। এবং পরবর্তীতে আমরা তো বাধ্য হলাম রাষ্ট্র কর্তৃক। এভাবে অফলাইনের আড্ডা অনলাইনে আসা শুরু করেছে অনেকের ক্ষেত্রে, আর আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে যোগাযোগের তাড়া কমে গেছে।

আরেকটা উদাহরণ দেয়া যায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে, আমার ব্যক্তিগত অভ্যাস ত্যাগ করে যখন আমি ঘরে ঢুকে গেলাম, তখন খেয়াল করলাম আমাদের আলম মামা, যার বাসার নীচে টং দোকান ছিলো, তিনি বেকার হয়ে পড়েছেন, তিনি এই কোভিড-১৯’র সময়েও কিভাবে বাইরে থেকে উপার্জন করা যাবে সেটা ভাবছিলেন, এখন উনি সবজী বিক্রি করেন। জরুরি অবস্থায়  সবজী বিক্রির বৈধতা আছে। আগের উদাহরণে যোগাযোগের মাধ্যম অভ্যাস পরিবর্তনের ব্যাপার থাকলেও, এখানে যোগাযোগের মানুষ ও জীবিকা দুই-ই বদলে গেছে। একদিকে আছে সতর্কতাও  সচেতনতার জন্য ঘরে থাকতে চাওয়া আর অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে বাইরে থাকতে চাওয়ার তীব্রতা। এই পরিবর্তন আমাদেরকে কোভিড-১৯ পরবর্তী পৃথিবীতে কর্মক্ষেত্রের কার্যক্রম পরিবর্তনের দরুন ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কর্মহীন হবার ইংগিত দেয়, ইংগিত দেয় দীর্ঘদিনের বন্ধ কারখানা থেকে অধিক উৎপাদনের জন্য অটোমেশনের সর্বোচ্চ ব্যবহার, আর  বাড়বে ঘরহীন মানুষের সংখ্যা।

সবশেষে বলা যায়, কোভিড-১৯ পরবর্তী পৃথিবী বদলে যাবে। সংস্কৃতি বদলাবে, বদলাবে আমাদের যোগাযোগের ধরণ।

নীচে আমার প্রিয় শিল্পী এস এম সুলতানের After the Flood চিত্রটা যুক্ত করলাম। ছবিতে সুর্যোগ পরবর্তী মানুষের অসহায় অবস্থা দেখা যাচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে পেশী বহুল মানুষেরা, যেখানে তাদের শক্তি ও সামর্থ্যের প্রকাশ পাচ্ছে এখানে। এই শক্তি ও সামর্থ্য দূর্যোগের কাছে আসহায় আবার এই শক্তি ও সামর্থ্য ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণাও। ছবিটি https://www.wikiart.org/ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। 

























After the Flood

SM Sultan
Date: 1986
Style: Expressionism 



Comments